October 11th, 2017

 

৬ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার তিনদিন পর ৯ অক্টোবর এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এবারের পরীক্ষায়  ৮২ হাজার ৭৮৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন এবং ৪১ হাজার ১৩২ জন জন ভর্তির জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য দেশের ৩১টি সরকারি মেডিকেল কলেজে মোট আসন ৩ হাজার ৩১৮টি এবং  ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মোট আসন ৬ হাজার ২২৫টি।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য দেশের এক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অন্য অঞ্চলে গিয়ে হোটেলে-আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে থাকতে হয় না। বাবা-চাচাদের রাজী করিয়ে ছাত্রীদের দূর দূরান্তে যেতেও হয় না।  দেশের এক অঞ্চলের মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যে কোন মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বচিত হতে পারে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী।

সেই সত্তর দশকের শেষের দিকে যখন দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে তখন থেকেই ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের হয়রানি লাঘবের জন্য এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়। কয়েক বছর আগে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
এবার ভাবুন যদি ৩১টি সরকারি মেডিকেল আর ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আলাদা আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা। তাই যদি হতো তাহলে চিকিতসক হতে আগ্রহী একজন শিক্ষার্থীর কী হাল হতো? তাকে এক শহর থেকে অন্য শহরে দৌড়াতে হতো কেবল ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। হয়তো আজ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিকেলেই রওনা দিতে হতো ঢাকার উদ্দেশ্যে। ঢাকায় পৌঁছে রাতের ট্রেনে তাকে যেতে হতো চট্টগ্রামে। কারণ কাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা। এই লিস্ট অনেক বড় করা সম্ভব, তবে তার দরকার নেই। এটি খুবই শান্তির বিষয় যে, মেডিকেলে ভর্তিচ্ছু ছেলে-মেয়ে এবং তাদের অভিভাবকদের এই হয়রানী পোহাতে হয় না।  এই ছবি যদি আমরা উচ্চ শিক্ষার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি দেখতে পেতাম তাহলে সেটি ছেলে-মেয়েদের ও তাদের অভিভাবকদের জন্য কতোই আনন্দের হতো। তবে, এটি যে আমার জীবদ্দশাতে দেখার কোন সুযোগ হবে কী না তা কেবল সর্ব শক্তিমানই বলতে পারেন।

বলছিলাম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কথা। দেশে বর্তমানে ১৩১টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনশ’র বেশি বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগে  সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউনিট হিসাবে ভর্তির ব্যবস্থা চালু হয়। তার আগে সেখানে বিভাগওয়ারী ভর্তির পদ্ধতি ছিল। এখনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ব্যবস্থা চালু আছে। এর ফলে, একজন শিক্ষার্থীকে কখনো কখনো বাক্স-প্যাটরা নিয়ে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য অন্য এক শহরে স্থানান্তর করতে হয়।

অথচ সামান্য উদ্যোগ নিলেই এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যায়। এমন সমাধান কিন্তু কোন নতুন নয়। মেডেকেলের কথা বাদ দেই। কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েটের  কথা ধরা যাক। প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার আগে এগুলো ছিল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজি (বিআইটি)। তখন এই বিআইটিগুলোর ভর্তি পরীক্ষা ছিল একসঙ্গে। এবং একটি মাত্র পরীক্ষা দিয়ে ছেলে-মেয়েরা চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা রাজশাহীতে ভর্তি হতে পারতো। কিন্তু, বিশ্ব যতোই আগাবে আমরা ততোই পেছাতে থাকি। তাই দুই দশক আগের ছেলে-মেয়েরা যে সুযোগ পেতো এখনকার ছেলেমেয়েরা সেটি পায় না। ঐ তিন বিআইটিগুলো বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর থেকে এখন আলাদা আলাদাভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেন। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই তাই।

ফলে, একজন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে এক শহর থেকে অন্য শহরে কেবলই ছুটে বেড়াতে হয়। গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভধ্যাপক মো. শহিদুজ্জামান একটি হিসা প্রকাশ করেছেন। সমন্বয়হীনতার উদাহরণ দেখিয়ে তিনি দেখিয়েছেন,  “বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থীকে ২০ অক্টোবর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে পরদিন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) পরীক্ষা দিতে হলে প্রায় ৪০৩ কিলোমিটার রাস্তা ভ্রমণ করতে হবে। এর পরদিন ২২ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা হলে ওই শিক্ষার্থীকে আরও ৫২৫ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হবে। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) পরীক্ষা দিতে চাইলে আবার চট্টগ্রামে আসতে ৫১৩ কিলোমিটার এবং পরদিন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাইলে আরও ৪৬৮ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হবে”। ভাবা যায়!

এর সঙ্গে আছে ভর্তি পরীক্ষার খরচ। একজন শিক্ষার্থীকে কেবল ভর্তি পরীক্ষার ফরমই কিনতে হচ্ছে না, একই সঙ্গে তাকে বিস্তর ছোটাছুটির খরচও বহন করতে হচ্ছে। আর ছাত্রীদের বেলায় খরচের মাত্রা আরও বেশি কারণ তাকে শহর থেকে শহরে ছুটে বেড়ানোর জন্য অভিভাবকদের কাউকে সঙ্গে নিতে হচ্ছে।

অথচ সামান্য উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া যায়। আর কাজটা শুরু করতে পারে দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি কম-বেশি একই রকম। সংশ্লিষ্টরা নিজেরা বসে এটিকে একটি সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসতে পারবেন, সহজে। এ পদ্ধতিতে একই দিনে, একই প্রশ্নপত্রে কুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মেধাতালিকায় স্থান নিয়ে একজন শিক্ষার্থী সহজে বুয়েটে বা চুয়েটে ভর্তি হতে পারবে। এর পরের বছরগুলোতে পবালিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুষদভিত্তিক পদ্ধতি চালু করে ফেলা সম্ভা হবে।
আমার এই প্রস্তাব শুনে যারা হৈ হৈ করে আসবেন তাদের জ্ঞাতার্থে শুধু এইটুকু বলা যে আজ প্রায় ৩০ বছর ধরে মেডেকেল কলেজগুলো এই সিস্টেমে চলছে। আর পাশের দেশের আইআইটি, এনআইআইটি, আইআইআইটিগুলোর ভর্তি পরীক্ষার এই সমন্বতি সিস্টেমের বয়স ৫০ পেরিয়েছে অনেক।

তবে, আমি এটি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমাদের দেশে এমন সিস্টেম কখনোই হবে না কারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানী ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা বিশেষ কেউ ভাবে না। কারও কfরও কাছে ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারটা হয়তো নিছক কতোগুলো সংখ্যা।

 

আরও পড়তে পারেন:
ওরা কেন পড়বে? কেন শিখবে?
জয় পরীক্ষা! জয় সার্টিফিকেট!
কুলিয়ার চরে বিশ্বের বৃহত্তম বিজ্ঞান ও আইসিটি ব্যবহারিক ক্লাশের প্রচেষ্টা!!!
প্রোগ্রামিং : শিখতে হবে নিজে নিজেই
সব মানুষের স্বপ্ন তোমার চোখের তারায় সত্যি হোক