April 19th, 2016

আমার খুব প্রিয় লেখকের একজন হুমায়ুন আহমেদ। আমরা যখন ছোট, মানে তখনো ছাত্র আর কি, স্যার একটা গান লিখেছিলেন। গানটা যে অবশ্য তাঁর লেখা সেটা আমি পড়ে জেনেছি। ঝাকড়া চুল ঝাকিয়ে গ্রামের পথে পথে সেই গানটা গাইতেন কুদ্দুস বয়াতী। এই দিন তো দিন নয়, আরো দিন আছে।

স্যারের উদ্দেশ্য পরিস্কার। তখন মাত্র আমাদের দেশে বেবি বুম হয়েছে। ওদের স্কুলে যাওয়া দরকার। আমাদের নতুন প্রজন্মকে স্কুলে পাঠাতে হবে। সবাইকে, যেন বাদ না যায় একটি শিশু।সেই থেকে গানটা আমার খুব প্রিয়। এবং আমার নানান কাজে এই গানটাই আমাকে অনেক প্রেরণা যোগায়।

বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর শতভাগ সাফল্য আমরা অর্জন করেছি। যদিও পঞ্চম শ্রেণী পেরোনোর আগেই অনেকে ঝরে পড়ে। ঝড়ে পড়া রোধ করার পাশাপাশি এখন আমাদের দরকার তাদেরকে বিশ্বমানে গড়ে তোলা। সহজ নয় কাজটা।

স্যার যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে স্যারকে দিয়ে আমি আর একটা গান লেখাতাম। সেটি বিজ্ঞান, গণিত আর প্রোগ্রামিং শিক্ষার জন্য। এখন যে জগৎ তাতে সফল হতে হলে সবাই অনেক ভাল প্রবলেম সলভার হতে হবে, থাকতে হবে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি। দুনিয়াটা এতো দ্রুত পাল্টাচ্ছে যে, তাঁকে অনেক কিছু নতুন করে করতে হবে। কারণ ‘অনেক কিছু এখন হবে যা আগে কখনো হয়নি’। একটি মেয়ে বা একটি ছেলে কীভাবে একটা নতুন জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে?

পারে যদি তার বিজ্ঞান-গণিতের ভিত্তিটা মজবুত হয়। কিন্তু আমাদের দেশের স্কুলগুলোরই খুব করুন অবস্থা। সেখানে বিজ্ঞানাগারের কী অবস্থা তা সহজে অনুমেয়। তাই ২০০১ সালে এসপিএসবি প্রতিষ্ঠার পর আমরা একটা ভ্রাম্যমান বিজ্ঞান জাদুঘর বানিয়েছিলাম, অণুসন্ধিৎসু চক্রের সঙ্গে মিলে। সেটি গ্রামে গ্রামে নিয়ে যেতাম যাতে বাচ্চাদের কিছু এক্সপেরিমেন্ট করানো যায়। কংকাল, মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ সবই একদিন চোর বেটা চুরি করে নিয়ে যায়। তবে, আমাদের স্বপ্নটা মরেনি। প্রথম সুযোগে, সরকারে কাজ করার সময়, ২০০৯-২০১১ সালে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিদ্যালয়ে কম্পিউটার ল্যাব বানানোর কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য নিজের প্রায় সব সময় উৎসর্গ করেছি। তারপর এখন আবার বিজ্ঞানের সেই কাজে ফিরেছি।

গণিত অলিম্পিয়াডের একটি কাঠামো দাড় হয়ে যাওয়ার পর, বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমানের প্রবল চাপে আমাদের শিশু কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস, বাংলাদেশ জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড এগুলো শুরু হয়ে যায়। কাজ করতে গিয়ে আমরা টের পাই, পরিস্থিতি আমার ছোটবেলার মতোই। এখনো বাচ্চাদের কেও এক্সপেরিমেন্ট করতে দেয় না।

কাজে আমরা ঠিক করলাম আমরা একটা বিজ্ঞান ল্যাবরেটিরী বানাবো, ট্রাংকের মধ্যে। মানে জিনিষপত্র সব ট্র্যাংকে থাকবে আর সময়ে সময়ে এসপিএসবির অফিসটাকে আমরা ল্যাব বানিয়ে নেবো। তা শুরু হলো সেই কাজ। ক কী থাকবে, কী কী করা যাবে এসবের তালিকা বানানো। টিম এসপিএসবির প্ল্যান সি (মানে কেও সহযোগিতা না করলেও আমরা করবো)-তেও দেখা গেল ম্যালা টাকা লাগে। ম্যালা মানে আমাদের জন্য অ-নে-ক আর কি।

এর মধ্যে একদিন খুব আশ্চর্য একটা ঘটনা ঘটলো। আমার ভাগ্নে বুয়েটের তড়িৎ কৌশলের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ফোন করে জানালো তার বাসার নিচ তলায় একটা দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাট আছে। সেটির ভাড়াটিয়াদের নোটিশ দিয়ে সে বিদায় করে দেবে এবং সেখানে আমাদের ল্যাবরেটরিটা বানানো যাবে। হয়তো জায়গা বেশি নয়, কিন্তু শুরু করা যাবে। (সেদিন ফোন নামিয়ে রাখার পর আমার চোখ জ্বালা করেছিল কেন জানি। আজ লেখার সময়ও করছে)

তো, শুরু হয়ে গেল আমাদের স্বপ্ন নির্মান। ভেবেছিলাম এপ্রিলের কোন একদিন করবো। কিন্তু দেখা গেল, একটা টেবিল কেনার টাকাও আমাদের হাতে নেই। কাজে আমরা একটু পিছালাম এবং শেষমেষ ঠিক করলাম সবার কাছে হাত পাতবো। সেটাই শুরু করেছি।

আমরা কী করছি?

maqsud1বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নামে আমরা বানাচ্ছি একটি বিজ্ঞানাগার। যেখানে হাতে কলমে বিজ্ঞান আর গবেষণা শিখবে আমাদের ভবিষ্যৎ মাকসুদুল আলমরা। বিজ্ঞান আসলে শুধু বইয়ে পড়ার বিষয় নয়, সত্যিকার বিজ্ঞান হলো হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখা। কিন্তু স্কুলে বিজ্ঞানাগার না থাকায় বা সুযোগ না পাওয়ায় অনেক সময় বিজ্ঞান পড়তে হয় দৈববাণীর মত। তাই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানাগারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই এ প্রয়াস।

বিজ্ঞানাগারটি হবে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত, বইয়ের পাতায় পড়া বিষয়গুলো যেমন সেখানে হাতে কলমে করে দেখবে তারা, সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য করতে পারবে ইচ্ছেমত পরীক্ষা -নিরীক্ষা। হয়ত এ বিজ্ঞানাগারেই হবে যুগান্তকারী বিজ্ঞানীর হাতেখড়ি।
এ বিজ্ঞানাগার ব্যবহারের সুযোগ পাবে যারা:
১. যাদের স্কুলে বিজ্ঞানাগার নাই বা থাকলেও সুযোগ কম তারা বইয়ের ব্যবহারিক অংশ করতে পারবে এখানে।
২. হাতে কলমে বিজ্ঞান বোঝার জন্য থাকবে ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিক্ষা। যেখানে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান এবং ইলেক্ট্রনিক্সের উপর থাকবে আলাদা কোর্স।
৩. নিজের মত করে কোন পরীক্ষণ করতে চাইলে বা গবেষণা করতে চাইলে অথবা বিজ্ঞান প্রকল্প করতে চাইলে সুযোগ থাকবে তারও। ব্যাবহার করতে পারবে বিজ্ঞানাগারের সব সুবিধা।
৪. এখানে থাকবে একেবারে পিচ্চিদের জন্য মজায় মজায় বিজ্ঞান শিক্ষা, যাকে বলে কিচেন এক্সপেরিমেন্ট।
৫. ইন্টারন্যাশনাল জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড (আইজেএসও) এর বাংলাদেশ দল, গুগল সায়েন্স ফেয়ার এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাওয়া বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিকের প্রস্তুতি নিবে এখানে।

বিজ্ঞানাগার চলবে যেভাবে
মাকসুদুল আলম বিজ্ঞানাগার চলবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (এসপিএসবি) সমন্বয় করবে শুধু, বাকি সব ব্যবহারকারীদের হাতেই। চাঁন্দা সিস্টেমে এর বিদ্যুৎ আর ইন্টারনেট বিল পরিশোধ করতে হবে।

কোথায় হবে বিজ্ঞানাগার
মাকসুদুল আলম বিজ্ঞানাগারের শুরু টা ছিল মিরপুরের শেওড়াপাড়ায়। যেখানে আমরা পেয়েছি বিজ্ঞানাগারের নামে ৪০০ স্কয়ার ফুটের দুই রুমের একটা ফ্ল্যাট। রান্নাঘর সহ মোট তিন রুম নিয়ে আমাদের স্বপ্নের বিজ্ঞানাগার। তবে, এখন ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য এটিকে স্থানান্তর করে এনেছি এলিফেন্ট রোডে। সেখানেই এসপিএসবির অফিসের সঙ্গে লাগোয়া এই ল্যাব।

যেমন অবস্থা এখন
আমরা বেশ কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছি। গত বছর আইজেএসওর-র শিক্ষার্থীরা এখানে কাজ করেছে। আইজেওসওর
যা যা লাগবে
খালি রুমগুলোকে বিজ্ঞানাগার বানিয়ে ফেলতে লাগবে একগাদা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, কতগুলো রাসায়নিক দ্রব্য, জীববিজ্ঞানের কতগুলো স্যাম্পল, এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য কয়েকটা টেবিল, যন্ত্রপাতি-দ্রব্যাদি রাখার জন্য তিনটা শেলফ, বিজ্ঞানের কতগুলো বই, বই রাখার জন্য একটা বুকশেলফ, দুইটা কম্পিউটার, তিনটা হোয়াইট বোর্ড, শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কতগুলা চেয়ার এমন কিছু জিনিস।
বিজ্ঞানাগারটি সুন্দরভাবে শুরুর পরিকল্পনাটা এখানে পাওয়া যাবে।
Maksudul Alam

আগেই বলেছি আমরা নিজেরা নিজেরা এমন একটা বিজ্ঞানাগার গড়তে পারবো না। লাগবে আপনার সহযোগিতা। আপনি পারেন –

১. বিজ্ঞানাগার বানাতে যা যা লাগবে তার কোন একটা বা কয়েকটা আপনি কিনে দিতে পারেন অথবা কেনার জন্য টাকা দিতে পারেন।
২. বিজ্ঞানাগারের জন্য দিতে পারেন আপনার পরামর্শ বা সরাসরি কিছু কাজও করে দিতে পারেন।
৩. আপনার বাসায় হয়ত এমন কিছু পরে আছে যা কাজে লাগতে পারে বিজ্ঞানাগারের জন্য, যেমন একটা বুকশেলফ বা কতগুলো বিজ্ঞানের বই, অথবা কম্পিউটার, দিতে পারেন সেগুলোও। (তবে তা অবশ্যই ব্যবহারের উপযোগী হতে হবে।)
৪. আপনি যদি থাকেন দেশের বাইরে, তাহলেও আপনি সহযোগিতা করতে পারেন। আপনি ল্যাবের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রপাতি বা কিছু বই জোগাড় করে পাঠাতে পারেন। অথবা ওগুলো কেনার জন্য কিছু টাকা পাঠাতে পারেন।

কেমন করে সেটা দেবেন তাঁর বিস্তারিত আমাদের এই সংক্রান্ত ইভেন্ট পেজে রয়েছে। কোন প্রশ্ন থাকলে আমার কাছেও জানতে পারেন।

এই বিজ্ঞানাগারের একটা বহির্মূখী আর্ম থাকবে। সেটি হলো বাসে/মাউক্রোবাসে/ভ্যানগাড়িতে করে ল্যাবরেটরির জিনিষপত্র নিয়ে একটি গ্রামে চলে যাওয়া। সেখানে ঐ গাড়ি নিয়ে আমাদের কর্মীরা দিন কয়েক থাকবে এবং গ্রামের বাচ্চাদের যতো এক্সপেরিমেন্ট দেখানো যায়, করানো যায় করিয়ে দিয়ে আসবে। একদিন হয়তো আমাদের নিজেদের একটা গাড়িও হবে ইনশা আল্লাহ। তার আগে আমরা মাইক্রো ভাড়া করে এই কার্যক্রম চালিয়ে নেব। এই কার্যক্রমে আমরা পাবো জাফর স্যারের “বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা” প্রকল্পের জিনিষপত্রগুলো।

আমি কখনো সৃষ্টিকর্তা আর তাঁর সৃষ্টিকুলের ওপর বিশ্বাস হারাই না। কারণ আমি জানি, সৃষ্টিকর্তা তাদেরকেই সাহায্য করেন যারা নিজেরা নিজেদের সাহায্য করে। সবার যুক্তে আমরা নিশ্চিয়ই সফল হবো।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এগিয়ে যাওয়ার তৌফিক দিন।

সবার জীবন পাই-এর মতো সুন্দর হোক।

এটি আমাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের ফান্ড রাইজিং

১. এর আগেরবার আমরা প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো তুলেছিলাম। সেটা দিযে চেয়ার টেবিল আর যন্ত্রপাতিগুলো কেনা হয়েছে। এবারের লক্ষ্য এর পরের ধাপের জন্য কিছু যন্ত্রপাতি কেনা। এছাড়া অনেকেই তাদের প্রেজক্ট করতে চাইবে যার জন্য স্পেশাল কিছু কিনতে হতে
২. এবার মাইক্রোভাড়া করে কয়েকদিনের জন্য বিজ্ঞান ক্যাম্প করার জন্য চলে যাবে দেশের কোন গ্রামাঞ্চলে। সেখানে থেকে হাতে কলমে বিজ্ঞানের একটা ক্ষেত্র তৈরি করে আসবে। এখনকার ল্যাবটি ফ্রি নয়। ভাড়া কক্ষে। এজন্য ভাড়ার টাকাটাও যোগাড় করতে হবে।

৩. হাতে কিছু টাকা থাকলে অনেক কিছুই তখন করা যায়।

সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

 

আরও পড়তে পারেন:
মেঘনাদ সাহা : জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞানের জনক
আইনস্টাইন আমার আইনস্টাইন
তোমার সন্তান না জাগলে মা সকাল হবে না তো?
শিখছি কোথায়, গরুর গুতায়!!!
উদ্যোক্তাদের মিলন মেলায় সাদর আমন্ত্রণ