ঐ দেখা যায়…

Spread the love

Math_2016গণিত উৎসব দিয়ে শুরু করেছিলাম বাংলাদেশ ঘোরা। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞান, উদ্যোক্তা এবং হালের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা। আমার জীবনও ক্রমাগত চাকার ওপর হয়ে যাচ্ছে। ১২ জানুয়ারি তারিখ খুব ভোরে, ফজরের নামাজের পরপরই রওনা হয়েছি নেত্রকোণার উদ্দেশ্যে। সেখানে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে ডাচ বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০১৬। আমাদের আয়োজনের ১৫ বছরের মধ্যে আমরা বাংলাদেশের সব জেলায় গণিত উৎসব করতে চাই। সেজন্য আমরা নতুন নতুন জায়গাতে প্রতিবছরই উৎসব করার চেষ্টা করি। এক জায়গায় কয়েকবার করতে পারলে আমাদের প্রাথমিক কাজটা হয়- উৎসাহ যোগানো।

ngpc1
ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক লাফিফা জামালের সঙ্গে নেত্রকোণার তিনকন্যা

নেত্রকোণাতে এবারের উৎসবের পেছেন রয়েছে সেখানকার ওয়েসিস-বিয়াম মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী ইপশিতা। ইপশিতা গত কয়েকবছর ধরে আমাদের গণিত উৎসবে আসছে, ভাল করছে। লীলাবতী ক্যাম্পে যোগ দিয়েছে। ১২ ডিসেম্বর আমরা প্রথমবারের মতো জাতীয় গার্লস প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করেছি। সেখানে নেত্রকোণার তিনটি ৫ম-৬ষ্ঠ শ্রেণির মেয়ে ২টা সমস্যার সমাধান করে আমাদের অবাক করেছিল। ওদের সম্মানে এবারই নেত্রকোণাতে গণিত উৎসবের ভ্যেনু ঠিক হয়েছে।(এখন তো মনে হচ্ছে নেত্রোকোণা আমাদের স্থায়ী ভ্যেনু হয়ে যাবে!)।

কোন এক জেলাতে শুরু করতে পারলে পরে সেখানে একটা ভাল আবহাওয়া হয়। যেমন ২০১৩ সালে আমরা জামালপুরে উৎসব করে এসেছি। তারপর থেকে তারা ময়মনসিংহ উৎসবে যোগ দিচ্ছে। গতকালের ময়মনসিংহ উৎসবে জামালপুর থেকে ১৭ জন এসেছিল, বাবা-মার সঙ্গে একটা বাস নিয়ে্যাবার সময় ওদের ৭জনই গলায় মেডেল ঝুলিয়ে গেছে! ঠিক একই চিত্র দেখেছি কুমিল্লায়। সেখানে চাঁদপুর থেকে এসে প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।

my2
নেত্রকোণা স্থায়ী ভ্যেনু হওয়ার সঙ্গে এই ছবির কোন সম্পর্ক নাই!

এগুলো আসলে আমাকে আমার আয়ারল্যান্ডের বন্ধু গর্ডন লাসলির একটা কথা মনে করিয়ে দেয়। গর্ডন আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে আয়ারল্যান্ড দলের ডেপুটি হিসাবে আসে প্রতিবছর। তাঁর হিসাব হল- তোমার দেশের কোথাও না কোথাও রামানুজনরা আছে। স্ট্যাটিসটিক্যালি থাকবেই। তোমার কাজ হবে ওদেরকে খুঁজে বের করা।
গর্ডন আমাকে গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য প্রয়োজনীয় বই-এর খবর দিত। নিজেই কুরিয়ার করে আমাদের জন্য বই পাঠিয়েছে এবং আমাদের ট্যালেন্ট সম্পর্কে কোন সন্দেহ ছিল না বলে ২০০৯ সালে আমাদের প্রথম পদক জয়ে সেই একমাত্র অবাক হয়নি। বলেছিল – আমি জানতাম। তবে, ভেবেছিলাম তোমরা আরো কিছুদিন সময় নেবে।
আমরা যখন গণিত উৎসব শুরু করি তখন বাংলাদেশে প্যাটনাম গণিতের একজন অংশগ্রহণকারী আমাকে একটা সহজ উপায় বাতলে ছিলেন। তার বক্তব্য ছিল – আইএমওতে ভাল করার জন্য সারাদেশে উৎসব করার দরকার নাই। প্রতিবছর আমি কয়েকটা প্রবলেম প্রথম আলোতে ছাপিয়ে দেব, তারপর সেখান থেকে ১০ জনকে, আমার কাছে এনে এক বছর ট্রেনিং দেবো। তাহলেই হবে। আমি তাঁকে সবিনয়ে বলেছিলাম – আইএমওতে পদক পাওয়া আমাদের দুইটা উদ্দেশ্যের দ্বিতীয়টা মাত্র। প্রথমটা হলো দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত পড়ার আনন্দটা তৈরি করে দেওয়া। কাজে আপনার প্রস্তাবে না!
তো, সেই গণিত অলিম্পয়াডে এখন আমরা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছি। তবে, আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে। কারণ আইওমওতে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে আমাদের আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের মধ্যে গণিতকে একটি সত্যিকারে প্রবলেম সলভিং সাবজেক্ট হিসাবেও এগিয়ে নিতে হবে। আর পথ চলতে চলতে আমাদের লক্ষ্যও ক্রমাগত রাস্তা পরিবর্তন করে। যেমন ২০১৬ আর ২০১৭ সালে আমাদের লক্ষ্য হল আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে আমাদের সব প্রতিযোগী যেন পদক পায় আর আমাদের মোট নম্বর যেন ১০০ হয়। আমার বা আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির কোন তাড়া নেই। আমরা আস্তে ধীরে যেতে চাই। এবং আল্লাহর রহমতে আমরা সঠিক রাস্তাতে আছি।

my1
ময়মনসিংহে জাতীয় সংগীতের সময় আফজাল স্যারের পাশে

নেত্রকোণাতে ৩ বছর বয়সী এক শিশুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সে বলেছে সে স্কুলে পড়বে না, গণিত অলিম্পিয়াডে ভর্তি হবে। গতকাল (১৩ জানুয়ারি) ময়মনসিংহে একজন শিক্ষক জানালেন গণিত অলিম্পিয়াড কীভাবে তার ছেলের চিন্তা-চেতনাকে বদলে দিয়েছে। “এখন আর তাকে পড়তে বলতে হয় না, সন্ধ্যায় অন্ধকার হওয়ার আগে বাসায় ফেরার জন্য বলতে হয় না, রাতের বেলায় দুধ খাওয়ানোর জন্য পীড়াপিড়ি করতে হয় না।” ছেলে তার বাবার সঙ্গে প্রতিদিন সকালে হাটতে যায়। দুইদিন আগে গরে ফেরার সময় সিড়িতে উঠতে উঠতে বলেছে- বাবা, বিড়ালের অংকটা এইমাত্র মিলে গেল।
আমি জানি, আমাদের এক নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে। মহান আল্লাহতায়ালা আমাকে এই পরিবর্তন লক্ষ করার সুযোগ দিয়েছেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমি দেখছি কীভাবে একটি প্রজন্মের মধ্যে নতুন করে স্বপ্নের জাল তৈরি হচ্ছে। তারা তাদের স্বপ্নের পেছনে দৌড়াচ্ছে, তৈরি হচ্ছে।
না, তারা কিন্তু রাজনীতি থেকেও দূরে থাকছে না। কারণ আইওমওর পদক বিজয়ীর মতো ওরাও ভাবছে দেশ ফিরে রাজনীতিও করতে হবে। তবে, তারা এখন তাদের কাজটা নিয়েই থাকতে চায়- ভালবাসার সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে। কারণ তাদের অনেকেই প্লেটোকে বলা সক্রেটিসের সেই কথাটা জানে – আলাদাভাবে দেশকে ভালবাসতে হয় না। যার যা কাজ, সেটাই সর্বোত্তমভাবে করাটাই হচ্ছে দেশপ্রেম। আমি এর সঙ্গে যোগ করি, সেটা হল সবচেয়ে বড় প্রার্থনাও।
একটি জ্ঞানভিত্তিক দেশ তৈরির রাস্তায় আমরা উঠেপড়েছি। রাস্তাটা মসৃণ নয়। এটা পথচারীরা জানে। জানে বলেই তারা নানানভাবে তৈরি হচ্ছে। আমাদের কাজ হবে তাদের জন্য রাস্তাটা পরিস্কার রাখা যাতে তারা এগিয়ে যেতে পারে। কাজে যে কদিন বেঁচে থাকবো “প্রাণপণে সরাবো জঞ্জাল”।
পথশেষে দূরের ঐ আলো আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি। আমাদের নতুন প্রজন্ম যখন নিজেরাই ঔ আলোর উৎস হয়ে উঠবে তখন হয়তো আমি থাকবো না।

কিন্তু ওপার থেকে জানবো – এ রাস্তার একটি নুড়ি আমিও ভেঙ্গেছিলাম!

সবার জীবন পাই-এর মতো সুন্দর হোক।

Leave a Reply