February 26th, 2016

teamইদানীং কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে দেখা হলে টের পাই তারা কতো যন্ত্রণার মধ্যে আছে। এদের যন্ত্রণার উৎস হলো তাদের কর্মী, কারো পুরানো কর্মী আর কারো নতুন কর্মী। অভিযোগ একটাই – কর্মীরা চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে না।
প্রথম প্রথম আমি একটু অবাক হতাম। পরে একটু ঘাটাঘাটি করে দেখলাম এটি বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা, বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা যখন দল গঠন করেন তখন থেকে। সামাজিক এবং ব্যবসা উদ্যোগ – দুইটাতেই এই ঝামেলাটা আছে।

আমার নিজের সে অর্থে কোন ব্যবসা উদ্যোগ নেই কিন্তু অনেকগুরো সামাজিক দোকান আছে। সেগুলোতেও অনেক কর্মী আমার সঙ্গে কাজ করে। তাদের সঙ্গেও আমার অনেক খটোমটো হয়, তবে মনে হয় মাত্রাটা বেশি নয়। ফলে, বেশিরভাগই কাজ ছেড়ে যাবার পরও কোন না কোন ভাবে সম্পর্কটা রেখে দেয়। এর বড় কৃতিত্ব আমার না, সম্ভবত কাজগুলোই এমন।
কিন্তু এটা তো ঠিক বিশ্বের সব বড় উদ্যোক্তা বড়ো হয়েছেন কর্মীদের ওপর দাড়িয়ে। এবং তাদের মতো করেই তারা বড় হতে পেরেছেন। তার মানে, সমস্যা জটিল হলেও অসমাধান যোগ্য নয়।

প্রথমে দেখা যাক শুরুর কর্মীদের সঙ্গে কেমন করে লাগে।

শুরু হয় তার কোন কাজ সেভাবে পছন্দ না হওয়ার মধ্য দিয়ে। যেহেতু আমি নিজে কাজটা শুরু করেছি তাই আমি ধরে নেই যে, আমি ছাড়া বিষয়টা আর কেও ভালভাবে, আমার মতো করে বোঝে না। কাজে আমি সবসময় তাদের খুঁত ধরি এবং আমি যে জ্ঞানে আর গরিমায় ওদের চেয়ে বড়ো সেটা চান্স পাইলেই বুঝিয়ে দেই। এই থেকে গ্যাপটা শুরু হয়।

দ্বিতীয় ব্যাপারটা শুরু হয় মাইক্রোম্যানেজমেন্ট থেকে। শুরুতে আমি একা ছিলাম। সব কাজই আমি নিজে করতাম কাজে সাপ্লাই চেইন হোক, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট হোক কিংবা সেলস-মার্কেটিং হোক – আমি তো সবকিছুই অন্ধি-সন্ধি জানি। আর এগুলো করার সময় আমি নাক গলায়। কারণ আমি টের পাচ্ছি ও যেভাবে করছে তাতে কয়েকদিন বেশি সময় লেগে যাবে, টাকা বেশি খরচ হবে। মানে দাড়ায় মাইক্রোম্যানেজার হিসাবে আমি তাঁর ভুলের দায় নিজে নিয়ে নিচ্ছি। মানে আমি তাঁকে তার মতো করে কোন সমস্যার সমাধান করতে দিচ্ছি না। এ থেকে সূত্রপাত নতুন অসন্তোষের, দুই পক্ষেরই। কর্মীরা আস্তে আস্তে রোবটের পরিণত হয়। কেবল নিজের কাজটা করে।

তবে, আনন্দের বিষয় হলো এটি কেবল আমার দেশের নয়া উদ্যোক্তাদের সমস্যা নয়, এটি প্রায় সার্বজনীন। যারা বড় হয়েছেস, বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তারা সবাই এই লার্নিং প্রসেসের ভিতর দিয়ে গিযেছেন। গিয়েছেন বলে নতুনদের সামনে এখন সুযোগ ভুলের পুনারাবৃত্তি না করা।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা এবং গত কয়েকদিনের পড়ালেখা ধার করে কয়েকটা মন্ত্র বলার চেষ্টা করি।

team2মন্ত্র এক : অদ্রি তলে বসি শিলাখন্ড বহে অদ্রিভার

পএটি আমার খুব প্রিয় একটা কবিতার লাইন এবং আমার জীবনের মন্ত্র। অক্ষয় কুমার বড়ালের এই কবিতার নাম – মানব বন্দনা। অদ্রি মানে পাহাড়। এর মানে হল হিমালয়ের একেবারে নিচে যে ছোট্ট নুড়ি পাথরটা আছে, সেটা যদি না থাকতো তাহলে আজ এভারেস্ট এভারেস্ট হতো না। কাজে উদ্যোক্তাকে প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে কর্মীদের কারণেই তার উন্নতি হবে, অবনতি হবে। এই বিশ্বাসটা মনের মধ্যে স্টাবলিশ করতে পারলেই প্রথম মন্ত্রটা সহজে আত্মস্থ হয়ে যাবে।

মন্ত্র দুই : বলো, বলো , কথা বলো

উদ্যোগের কাজ সেটা যায় হোক অন্য কেও এসে করে দিবে না। নিজদেরই করতে হবে। আর এজন্য দরকার কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা। নিজের স্বপ্ন, ক্ষমতা আর স্টাইল কর্মীদের মধ্যে সঞ্চালন করার জন্য দরকার তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলা। দাড়ান, দাড়ান। সারাক্ষণ কাজের কথা বললে কিন্তু হবে না। “ফালতু আলাপ”ও কিন্তু করতে হবে। তার মানে মিটিং-সিটিং ছাড়াও সময় পেলে কথা বলতে হবে। ফ্যাক্টরিতে যদি দেখেন কোন কর্মী অলসভাবে দাড়িয়ে আছে এবং তার আলসেমির জন্য প্রোডাক্ট লাইনের ক্ষতি হচ্ছে না, তাহরে তার সঙ্গে একটু আলাপ করুন। তার ভাল-মন্দ দিয়ে শুরু করে ফ্যাক্টরির ভাল মন্দে এসে পড়ুন। আর মিটিংগুলোতে একটা জিনিস খেযাল রাখতে হবে – এগুলো যেন কোনভাবেই বিচার সভা না হয়! কর্মী সভাতে কর্মীদের হ্যারাজ করা যাবে না, কোনভাবেই।

এটা আমি শিখেছি লুৎফুল কবীর স্যারের কাজ থেকে। বুয়েটের আইআইসিটিতে ্রতি সোমবার আমাদের মিটিং হতো। বেশিরভাগ দিন্ই আমরা নানান ভুলের জন্য ধরা খেতাম। কিন্তু মিটিং-এ কাজটা কেন হয়নি সেটার চুলচেরা বিশ্লেষন করা হতো না। এক দুই কথার মধ্যে স্যার যা বোঝার বুঝে নিতেন। তারপর আলোচনাটা হতো কীভাবে কাজটা ঠিকঠাক মতো, সময়ের মধ্যে শেষ করা যাবে। এজন্য তারই সাজেশন নেওয়া হতো। হতে পারে সেটার জন্য দলনেতা পরিবর্তন করা কিংবা অন্য একজনে ঐ টিমে দেওয়া এবং কখনো কখনো স্যার নিজে ভলান্টিয়ার করতে ঐ কাজে যুক্ত হয়ে। এটা একটা বড় শিক্ষা। মিটিং-এর প্রভাবই কিন্তু পুরো প্রতিষ্ঠান জুড়ে পড়ে।
যদি মিটিং হিটলার কায়দায় না হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানে একটা খোলামেলা মুক্ত আবাহাওয়া তৈরি হয়। তখন সেখানে একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকে।

মন্ত্র তিন : শেখাও, শিখো

তোমার মতো করে তোমার প্রোডাক্টকে কেও ভালবাসে না, শুরুতে। কাজে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই তারা জানবে না। তাদের সেটা শেখাতে হবে। হাতে ধরে শেখানে সবচেয়ে ভাল হয়। নিজের সৌন্দর্যের মাপকাঠিও এক ফাঁকে বলে দিতে হয়। তাতে কর্মীরা বুঝবে তারা কতোটা পারে, কতোটা বুঝে এবং প্রতিষ্ঠানে তাদের অবদান কতো। সেই সঙ্গে কয়েকটা বিষয়ে ট্রান্সপারেন্টও হতে হবে – কোম্পানির আয়-ব্যায়ের হিসাব, বাজারে প্রভাব প্রতিপত্তি, মার্কেট ভ্যালু এসবও যের কর্মীরা সহজে জানতে পারে সেটার একটা ব্যবস্থাও থাকা দরকার। এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মীদের মধ্যে ওনারশীপ ডেভেলপ করা। মালিক আর মালিকানা বোঝ কিন্তু এক না। মালিকানা বোধের জন্য মালিক হওয়া লাগে না। তাদেরকে বোঝাতে হবে, তোমরা ভাল করলে সবারই লাভ। সেটা দরকারি। আর এটা হয় কয়েকভাবে

  • যা সে জানে না তাকে সেটা শিখিয়ে দেওয়া কাজের ছলে, শেখাচ্ছি বলে নয়। এতে দক্ষতা ও ডেলিভারি বাড়বে
  • সে যা জানে তা যেন অন্যদের শেখায় তার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। এটা স্নেহের মতো। নিজে যদি করেন, তাহলে অন্যরাও করবে
  • মিটিং গুলোতে আয় ব্যায়ের হিসাব দেওয়া, বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট/বেতন বৃদ্ধি এসব সিদ্ধান্ত সবাইকে ডেকে বলা, এর ফলে কোম্পানির একাউন্টে কী প্রভাব পড়ছে সেটাও বলা

এর ফলে কর্মীদের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হবে ফলে লাল-ফিতার ব্যাপারটা থাকবে না।

মন্ত্র তিন : সাফল্যের সঙ্গে ফেইল করতে দেওয়া

সাকসেসফুলি ফেইলিওর কথাটা আমি বছর কয়েক আগে প্রথম বলতে শুরু করি। আমাদের দেশে আমাদেরকে সমাজ সবসময় ফার্স্ট হতে, সফল হতে বলে, ব্যর্থ হতে শেখায় না। কিন্তু কবির ভাষায় – শিখছি কোথায়, ঠেকছি যেথায়। তার মানে হল ঠেকাটা একটা পার্ট। অনেক সময় আপনি জানবেন যে, ও যে রাস্তায় যাচ্ছে তাতে ফেইল করবে, তাকে ফেইল করতে দিন। তাতে সে নিজের দুর্বলতা যেমন ধরতে পারবে তেমনি সেটা ঠিক করার রা্তাটাও পাবে।
মন্ত্র চার : কর্মীদের ওপর আস্থা রাখুন

শুরুতে তাকে আস্থা অর্জনের সুযোগ দিন। ছোট ছোট বিষয়গুলো তার ওপর ছেড়ে দিন। আস্তে আস্তে তাকে আরো এমপাওয়ার করেন। যতো বেশি আস্থা রাখবেন ততই সে ভাল কাজ করবে। ওদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন, সেটা এক্সিকিউট করতে দিন।

মন্ত্র পাঁচ : নিয়ন্ত্রক নয়, ফ্রেন্ড/ফিলোসফার/গাইড হোন

আমাদের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা জাত ইচ্ছ আছে। রাস্ট্রীয় উদাহরণ হলো টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। সিঙ্গাপুরে এই কাজ যে সংস্থাটি করে সেটির নাম হলো ইনফরমেশন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি মানে উন্নয়ন সংস্থা। তো, আমরা আমরাই তো দেশ। কাজে আমাদের নিয়ন্ত্রণ সংস্কৃতি আমাদের উদ্যোগেও হাজির থাকবে, এ আর অস্বাভাবিক কি!

তো, নিয়ন্ত্রকের ভাবমূর্তি থেকে বের হোন। কর্মীদের বন্ধু, ফিলোসফার গাইড হোন। এক কথায় মেন্টর হওয়া।
আমি যখন বুয়েটে চাকরি করতাম তখন মুজিবুর রহমান স্যার থেকে আলী মুর্তাজা স্যার, আমার সব বসই আমার স্যার ছিলেন। তাদের কাছে ভুল করলে যতোটা না ভুলের জন্য বকা খেতাম তার চেয়ে বেষি ষিখতে পারতাম। স্যাররা তো ধরেই নিতেন মুনির তো ভুল করবে।

আপনি যেহেতু কাজটা আগে শুরু করেছেন কাজে আপনি অনেক কিছু বেশি জানবেন। জানবেন বলে মনে মনে একটা ভাব নেবেন, সেটা করবেন না।আস্তে আস্তে প্রতিদিনকার কাজ কর্মীদের হাতে ছেড়ে দিন।
তাহরে তারা ভালোও করবে এবং আপনিও নেতা হয়ে উঠবেন। সেই নেতা নয় যার ক্ষমতা আছে, সেই নেতা যিনি অন্যদের

এই পাঁচটা আমার মন্ত্র। এগুলো আমি মেনে চলি গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান কিংবা এসপিএসবিতে এবং আমার কর্মক্ষেত্রেও।
আপনারগুলো আপনাকে বের করে নিতে হবে। এটা হয়তো সাহায্য করবে।

আরো একটা কাজ আমরা করবো “টিম বিল্ডিং আর রিটেইনিং-এর ওপর একটা মুক্ত আড্ডা দেবো আগামী ৫ মার্চ ২০১৬ তারিখে। জায়গাটা এখনো ঠিক হয়নি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র পাওয়া গেলে সেখান না হয় আমাদের অফিসে। সেখানে আমাদের গ্রুপের উদ্যোক্তা যাদের অনেক কর্মী চালাতে হয় তারা তাদের অভিজ্ঞতা মন্ত্র শেয়ার করবেন। যারা আগ্রহী তারা এখন থেকে ক্যালেণ্ডার বুক করে রাখতে পারেন।

অদ্রি তলে শিলাখন্ড বহে অদ্রিভার।

সবার জন্য শুভ কামনা।
 

আরও পড়তে পারেন:
উদ্ভাবনের কলকব্জা ৭: মোবাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির রেজিস্ট্রেশন
আজ ও আগামী দিনের নায়ক - অবতরনিকা
স্টার্টআপ গন্তব্য?
বিশ্ব যতো এগিয়ে চলে
গ্রোথ হ্যাকিং মার্কেটিং-১২: অলওয়েজ বি টুইকিং