October 14th, 2017

আজ প্রথম আলো আর ব্র্যাক ব্যাংক অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা দিয়েছে। ১৯৯৯ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে অদম্য মেধাবীদের পাশে দাড়াতে শুরু করে প্রথম আলো। সেবার আমরা আয়োজন করেছিলাম কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা। সেখানেই একজনের কথা জানা যায় যার পক্ষে পড়াশোনা এগিয়ে নেওয়া কঠিন। তখন তার পাশে দাড়ান প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। ঐ ছেলেটি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন।
অদম্য মেধাবীদের পাশে দাড়ানোর কাজটি আনুষ্ঠানিকতা পায় প্রথম আলো ট্রাস্ট গঠনের পর এবং ২০১০ সাল থেকে ব্র্যাক ব্যাংক যুক্ত হয়। তারপর থেকে প্রতি বছর ৫০ জন এসএসসি উত্তীর্ণ মেধাবী এই বৃত্তি কার্যক্রমে যুক্ত হয় যারা সফলভাবে আগাতে পারলে স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পায়। আজকে নতুন ৫০ জন, সঙ্গে ২০১৫ সালে যারা এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে যারা আবার জিপিএ ৫ পেয়েছে এবং যারা এবারের এইচএসসি পাশ করে মেডিকেল সুযোগ পেয়েছে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
মেডিকেল সুযোগ পাওয়া তিনজনের মধ্যে একটি মেয়ে ছিল। ওর কথা আমি আগে শুনেছি, কিন্তু দেখা হয়নি। মাহফুজা নামের এই মেয়েটি এসেছে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার এক হতদরিদ্র পরিবার থেকে। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাবার পর প্রথম আলোর সাংবাদিক শহীদ ভাই তাকে নিয়ে প্রথম আলোতে লিখেন। এরপর সে নির্বাচিত হয় অদম্য মেধাবীদের ৫০ জনের তালিকায়, ভর্তি হয় রংপুর কারমাইকেল কলেজে।
এবছরের জানুযারি মাসে, এডুকেশন ফর অল নামের এক পাগলামী কর্মকাণ্ডের খবর জানতে পারে সে প্রথম আলোর ঐ প্রতিনিধির মাধ্যমে। জানতে পারে ইএফএর ভাইয়েরা দরিদ্র কিন্তু লড়াকু শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ব্যাপারে সহায়তা করেন। ঐ সহায়তা পেতে হলে একটা পরীক্ষা দিতে হয়। মাহফুজা ঐ পরীক্ষা দিয়ে নির্বাচিত হয়। তারপর ইএফএ-র ভাইয়েরা তাকে নিয়ে আসে ঢাকায়। থাকা খাওয়ার খরচ, আর ভর্তি পরীক্ষার খরচটা ইএফএ দেবে।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটা বাড়িতে ইএফএ-এর এবারের হোস্টেল। শুরু হলো এক অদম্য যাত্রা। লক্ষ্য মেডিকেল ভর্তি। রাজীব আর সাইফুরের সযত্ন প্রয়াস। শুরুতে ভার্সিটি কোচিং-এর দিকে একটু আগ্রহ থাকলেও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাবার পর সাইফুররা সেটিও বাদ দেয়। এই সময় সাইফুর আমাকে একদিন জানায় মাহফুজার কথা। বলে ও মেডিকেলে হবেই। এডুকেশন ফর অলের এবারের শিক্ষার্থীদের কোচিং হয়েছে বর্ণ কোচিং সেন্টারে। সেখানে ইএফএ-এর আগের ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও ক্লাস নিয়েছে।
সাইফুর-রাজিবের সযত্ন প্রয়াস এবং একদল অদম্য মেধাবীর সহায়তা ক’দিন আগে হয়ে যাওয়া মেডিকেল পরীক্ষায় ২৯০তম হয়ে মাহফুজা তার মেধার অনন্য স্বাক্ষর রেখেছে।
আজকে স্টেজ থেকে নামার সময় ওকে আমি থামাই।
“আমি কি তোমার সঙ্গে একটা সেলফি তুলতে পারি?”

মাহফুজা অবাক হয়। ছবি তুলে চলে যায় নিজের আসনে। কিন্তু ফোনের ছবি বের করে দেখি ছবিটা তেমন ভাল হয়নি। এমনিতে আমি সেলফি তুলতে পারি না। তারপর মান্ধাতার আমলের ফোন। তো, কী করি?
অনুষ্ঠান শেষে মাহফুজাকে আবার খুঁজে বের করি। মিলনায়তনের শেষের দিকে মাহফুজা বসে আছে তার ভাই-এর সঙ্গে। ভাইটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রিকশা চালায়। ওর বাবা এখন আর কিছু করার সামর্থ রাখে না। বাবা মা থাকেন পঞ্চগড়ের সেই গ্রামে।
আমাকে দেখে মাহফুজা অবাক হয়। ওর বিস্মিত চোখের সামনে ডেকে আনি প্রথম আলোর আলোকচিত্রী সালামকে। সালামের ক্যামেরাতে শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত ছবিটি তুলেছি।
ততোক্ষণে খাবার দেওয়া হয়েছে। আমার এই ছবি তোলার তৎপরতার কারণ জানানোর জন্য আমাকে বলতে হলো সাইফুর-রাজীব-নূরের এডুকেশন ফর অল পাগলামীর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা আছে। আমি এই কার্যক্রমের নিতান্তই ফাঁকিবাজ চেয়ারম্যান!
ওকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আমি চলে এসেছি। ততোক্ষণে আমার দু’চোখ ভিজে উঠেছে জলে, আনন্দের।
রাব্বুল আলামিনকে বলবো তিনি যেন এমনতর স্বপ্ন পূরণের জন্য এডুকেশন ফর অলের কার্যক্রমকে বেগবান করতে সাহায্য করেন।

 

আরও পড়তে পারেন:
বঞ্চিত আনন্দময় শৈশব
দ্বিগুন, দ্বিগুন, খাটুনি আর কষ্ট!
উসাইন বোল্টের সঙ্গে সেলফি? - না থাক!!!
অনুপ্রেরণার গল্প-১ : বাঁ হাতেই বিশ্বজয়
সব মানুষের স্বপ্ন তোমার চোখের তারায় সত্যি হোক