June 5th, 2014

 

DU_examআমি এইচএসসি পাশ করি ১৯৮৪ সালে। তারও আগে, আমাদের পাড়ায় একজন সিনিয়র ভাই ছিলেন, শহিদুল ইসলাম বাদল (প্রকৌশলী, বর্তমানে নিউজিল্যান্ড প্রবাসী)। বাদল ভাই ছিলেন আমাদের বন্ধু, ফিলসফার এবং গাইড। স্কুলে অঙ্ক নিয়ে কোন ঝামেলা হলে তার কাছে যেতাম, ইন্টারে ম্যাথের প্রাইভেটটাও তাঁর কাছে পড়েছি। তো, বাদল ভাই-এর কাছে জীবনের লক্ষ্য ছিল একটা- বুয়েটে ভর্তি হওয়া। কিন্তু তিনহাজারের গ্যাড়াকলে তিনি বুয়েটে পরীক্ষা দিতে পারেননি, পড়েছেন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সেই থেকে আমরা যারা তার ছোট তাদেরকে দেখা হলেই তিনি একটি মন্ত্র দিতেন – ফার্স্ট ডিভিশন বা স্টার কিংবা স্ট্যান্ড করাটা কোন কাজের কাজ না, যদি তুমি বুয়েটে ভর্তি হতে না পারো!!! আর বুয়েটে ভর্তি হওয়ার জন্য কেবল দরকার ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথ!

বাদল ভাই-এর পাল্লায় পড়ে আমার এমন অবস্থা হল যে, আমি বাংলা আর ইংরেজি পড়া বাদই দিলাম। খালি ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথ। এমনকি সাজেশনের তোয়াক্কা না করে বইগুলোর সব কাল কাল অংশ পড়ে ফেলেছি। কাজে আমি যেদিন বুয়েটের লাইব্রেরিতে ভর্তি পরীক্ষা দেই সেদিন সেই হলে আমিই ছিলাম একমাত্র যে বোর্ডে প্লেস করে নাই কিন্তু ফিজিক্স কেমিস্ট্রি ম্যাথে প্রায় ৯০% নম্বর পেয়েছে!
সে যাই হোক। ভর্তি পরীক্ষার ফরম নিতে যখন আসি তখন শুনলাম সবার পছন্দ হলো ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। মানে সেটা হল ফার্স্ট চয়েজ। যেমন মেডিকেল ডিএমসি। কাজে, সবার মত আমিও সেটাই দিলাম। এবং ভর্তিপরীক্ষার মেধা তালিকার সামনে থাকায় সেটাই পেয়েছি। কিন্তু তখন জানতাম না ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপারটা কী?
ডিএমসির ব্যাপারটা বোঝা যায়। কারণ সারা দেশে মেডিকেল কলেজগুলোর সিলেবকস এক। কাজে সবচেয়ে বনেদিটাতে পড়াটা সবার প্রথম পছন্দের হবে সেটা স্বাভাবিক।
কিন্তু সিভির ইঞ্জিনিয়ারিং এর সঙ্গে ইলেকট্রিক্যালের পার্থক্য কে জানে? আমি তো জানি না। আমার চাচা, তখন রেলের বড় প্রকৌশলী, নিজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বললেন ইলেকট্রিক্যালএর তো চাকরি নাই, পড়ে কী হবে! তারপরও অন্যদের থেকে তো পিছায় থাকতে পারি না।

du_exam2
বুয়েটে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর আমরা একটা বিজ্ঞান চেতনা কেন্দ্র বানাই। সেখানে আমরা ব্যপকভাবে ফিজিক্স পড়তে শুরু করি। আমার তখন মনে হত, আহা, ফিজিক্স কেন পড়লাম না!!!
আমাদের ক্লাসের কয়েকজনকে দেখেছি, ওরা পরে আবিস্কার করেছে ওদের পড়া দরকার ছিল সিভিল কিন্ত পড়ছে ইলেকট্রিক্যাল। আমাদের আগের ব্যাচের তুহিন তো, মেকানিক্যাল পড়বে বলে একবছর লস দিয়ে আবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মেকানিক্যাল-এ ভর্তি হয়েছে।
আমাদের সময় ভর্তিপরীক্ষা ততটা কঠিন ছিল না, এখন যতটা হয়েছে। ইচ্ছে করলে কয়েকজায়গায় পরীক্ষা দিয়ে ভর্তিও হওয়া যেত একসঙ্গে। কাজে, ক্লাশ করেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। এখন তো সেই সুযোগ নাই।
এখন সকল সিদ্ধান্ত নিয়েই ভর্তি হতে হয়।
আর আমাদের বিভাগ নির্বাচনের পুরোটা হয় পরের মুখে ঝাল খেয়ে!
এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখার যে স্টাইল সেটি এককরম আর অনার্স কোর্স সম্পূর্ণ অন্যরকম। কারণ সেটা বিশেষায়িত। অনেক কিছু পড়ার সুযোগ সেখানে থাকে না। ইন্টারে ম্যাথ করতে ভাল না লাগলে কয়েকদিন ফিজিক্সে ডুব মারা যায়। কিন্তু যে কীনা ম্যাথে অনার্স করবে তারা খাই না খাই ম্যাথই করতে হবে!!!
এমন একটা খাই না খাই-এর সিদ্ধান্ত কী আমাদের শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে নিতে পারে এখন না কি আমাদের মত বাদল ভাই, ইনি চাচা কিংবা মামারা সেটি ঠিক করে দেয়?
পশ্চিমা বিশ্বে তাই এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীকে নিতে দেয়। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো প্রথম বর্ষে সবাই একই জিনিস পড়ে। তারপর ঠিক করে কোনটাতে স্পেশালাইজেশন করবে। আমাদের আর সেখানে ফেরৎ যাওয়ার উপায় নাই।
কাজে, বিষয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় সঠিকভাবে বাছাই করার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের কী সব তথ্য থাকে? তারা কি হুজুগে কোন সিদ্ধান্ত নেয়? কেন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যদিও বা তার পছন্দের বিষয় সে পায় খুবিতে? এ কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের জন্য?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে এখন ১০৪টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সে কারণ আমরা ধারণা নিজের পছন্দের বিষয় না হলেও গোটা বিশেক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে। তাহলে সেখান থেকে কোনটা তার পছন্দ করা উচিৎ?

বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দের বেলায় কী কেবল না, বাপ-চাচাদের পছন্দ, প্রেমিক/প্রেমিকার বাড়ি বা বিশ্ববিদ্যালয় – এইসব কিছুকেই প্রাধান্য দিতে হবে? নাকি অন্য কোন কিছু আছে?
এইবারে যারা এইচএসসি পাশ করেছে তাদের চিন্তাভাবনার জগতে আমার কোন এন্ট্রি নাই। থাকলে হয়তো বুজতে পারতাম। তবে, এটা বুজি যে, হাতে গুনা কয়েকজন এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোথায় পড়বে এবং তারা সেখানে পড়তে পারবে। কিন্তু বাকীদের অনেকই ব্যাপারটা ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল আর ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পন করে রেখেছে। তাদের জন্য কী কোন পরামর্শ দেওয়া যায়?

চার বছর পরে কর্মসংস্থান, দেশ এবং বিদেশের গন্তব্য এবং ডিগ্রীর বাজার মূল্য নির্ধারণ করার কোন প্রক্রিয়া যদি শিক্ষার্থীদের জানা থাকে তাহলে কী সেটা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে?

আমি ঠিক বুঝি না।

আগামী কয়েকদিনে যদি এই বোঝার কাজটা করতে পারি তাহলে চেষ্টা করবো কিছু তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে সেটি সংশ্লিষ্টদের জানাতে। আর যদি আলসেমির জন্য সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে নিজগুনে মার্জনা করে দেবেন।

সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

আরও পড়তে পারেন:
ওরা কেন পড়বে? কেন শিখবে?
চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে
সবার জন্য শিক্ষা-২:দুর্জয় তারুণ্যকে রুখবে কে
দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলো না
প্রোগ্রামিং : শিখতে হবে নিজে নিজেই

Comments

  1. kabyo says:

    khub valo laglo sir apnar lekhata pore tobe chittagong engineering college je ekhon CUET seta jodi janten aro valo lagto.

    1. Munir Hasan says:

      বাদল ভাই যখন পড়তেন তখন সেটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল।

  2. Rashed says:

    বাংলাদেশে যে এখনও দুইটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আছে তা অনেকেই জানে না— সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ময়মনসিং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। প্রতিষ্ঠাকাল ২০০৭। দুইটাতেই CSE, EEE, CE আছে তবে এখন সিলেটে CSE আর ময়মনসিং এ EEE চালু আছে, খুব শীঘ্রই বাকী বিভাগগুলো চালু হবে……… আর ইনশাআল্লাহ্‌ ২-৩ বছরের মাঝেই হয়ত এগুলোও উয়েট হয়ে যাবে অর্থাৎ SUET আর MUET ……………… আর এগুলোর একটা শাহজালাল আর অন্যটা ঢাবির আন্ডারে। তাই ভর্তিচ্ছুদের টার্গেট হতে পারে এগুলোও। সবার জন্য শুভকামনা।

  3. Siam Maksud says:

    Thanks a lot sir.
    Ami SSC exam dilam. Golden asche. Result er por ma, baba khub khushi chilo. Kintu notre dame college e bhorti hote na paray tara oti dukhito. Sir ami science khub bhalobashi. Robotics porar jonno ami ekhon thekei prostuti nite chai.

    ei holo amr present obostha.Ami mofossholer chatro.

    apni ki kuno advice dite parben?

    1. Munir Hasan says:

      তোমার শহরের একটা কলেজে পড়। নটরডেমেই পড়তে হবে এমনটা ভাবার দরকার নাই।
      তুমি যদি ভাল করতে চাও তাহলে এখন থেকে পড়ালেখাটা জোর দাও।
      আমার কয়েকটা পরামর্শ-
      ১. বাজারে সিলেবাসের বই পাওয়া যায়। সেটা কিনে আনো। তার সিলেবাসকে ভাগ করে ফেল। তোমার টার্গেট থাকবে ৯ মাস-৯ মাসে সব শেষ করা।
      ২. নিজের একটা রুটিন বানাও। সপ্তাহে ৫দিন কলেজের সঙ্গে সঙ্গে তোমারও সমান তালে পড়তে হবে। শুক্রবার নো পড়ালেখা। শিনবার ইচ্ছে মতন।
      ৩. কলেজের থেকে একটু আগে থাকতে হবে। যেমন কাল যেটা কলেজে পড়াবে সেটা তোমার আজকের মধ্যে অন্তত একবার পড়ে ফেলতে হবে। তাহলে ক্লাশটা আকর্ষনীয় হবে। পড়ে যখন আবার বাড়িতে ফিরবা তখন সেটা একবার রিভিশন করতে হবে।
      ৪. ক্লাসে লেকচার খাতাতে তুলে ফেল। সাজেক্টওয়ারি খাতা হলে ভাল। তারিখ আর চ্যাপ্টারের নাম লিখতে ভুলো না।
      ৫. তুমি কোন শহরে? পাবলিক লাইব্রেরি কত দূরে? কলেজে লাইব্রেরি আছে। তাহলে লাইব্রেরিতে যাওয়া অভ্যাস করো।

      আপাতত এই টুকু।
      তোমার জন্য আমার প্রিয় কবির দুই লাইন

      মুসা ইব্রাহিমের এভারেস্ট জয়
      প্রমাণ খুঁজিয়া পাই
      চেস্টা করিলে বাঙ্গালি পারে না
      এমন কাজ তো নাই।

      তোমার জীবনের সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

  4. Md. Imran khan says:

    Sir, apnar next lekhar opekkhae thaklam. Different varsityr department gular real condition clear hoar jonno ekta group create kora dorkar, jekhane shobai nijeder experience share korte parbe.