September 30th, 2017

আগের পর্ব

সব কিছু শুনে আমি গেলাম ফরহাদ ভাই-এর অফিসে। ফরহাদ ভাই, মানে ফরহাদ মাহমুদ, দৈনিক সংবাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার সম্পাদক। তার কাছে গিয়ে বললাম এখন ৪/৫ দিনে কীভাবে এই  সমস্যার সমাধান করা যাবে?

তখন মোবাইল ফোন নাই। এমন কি টিএন্ডটি ফোনও সবার কাছে নাই। তিনি আমার কাছ থেকে সব কিছু শুনলেন।
সাইজ কী হবে?
-ডিমাই, ওয়ান এইট।
কভার?
-ফোর কালার।
কভার ডিজাইন হইছে?
-না, হয় নাই।
ম্যাগাজিনের নাম কি?
-তাইতো। এই স্যুভেনিরের নাম কী? আমিই তো জানি না। বললাম ক্যাম্পাসে ফিরে জেনে নেবো।
ম্যাটারের কী অবস্থা?
-কেউ জানে না। কিছু বিজ্ঞাপনের ম্যাটার নিজেদের করে নিতে হবে।

ফরহাদ ভাই প্রথমে আমাকে নিয়ে গেলেন জলি আপার কাছে। জলি আপা সংবাদেই কাজ করেন। জলি আপাদের একটা ডিমাই প্রেস আছে উয়ারীতে। সেখানে কয়েকটা ফর্মা ছাপাতে হবে। তারপর দুইটা ঠিকানা দিলেন। একটা আরামবাগে মুসা ভাই (কার ভাই কে জানতে চায়) –এর প্রেস। গেলাম। গিয়ে বললাম শাদা কালো ৬৪ পৃষ্ঠা ছাপাতে হবে। তবে ম্যাটারের খবর নাই। কাগজের একটা হিসাব করলেন। বললেন পেস্টিং করে নিয়ে আসেন ছাপায় দেবো।

তারপর গেলাম মতিঝিলে। একটা কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে। বললো রাতের বেলায় তারা কম্পোজ করে দেবে যদি ম্যাটার দিতে পারি।

পরের কয়দিন আমি কি করছি সেটা হলফ করে বলতে পারবো না। শুধু মনে আছে পল্টন থেকে প্লেটগুলো বানায়ে সেগুলো দিয়ে এসেছি মুসা ভাই-এর প্রেসে। সেখানে কাগজ কিনে দিয়ে আর মেশিনম্যানকে বিরিয়ানির প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে দৌড়াইছি উয়ারীতে। সেখানে জলি আপাদের প্রেস। ওরা ছাপিয়েছে ১৬ পৃষ্ঠা আর চার রঙা কভার। সেখানকার ফর্মাগুলো নিয়ে হাজির হয়েছি পল্টনে যেখানে বাধাই হবে। সারারাত বাঁধাই হবে। কাজে ওখানেও বিরিয়ানি কিনতে হবে। এর মধ্যে একদিন রাতভর আমার সঙ্গে বসে প্রূফ দেখেছেন লুৎফুল কবীর স্যার।

ইলেকট্রিক্যাল ডের দিন সকাল ৮টার সময় ২০০ কপি বই নিয়ে আমি পৌছেছি ক্যাফেটেরিয়ার সামনে। বিজয়দের কাছে সেটা দিয়ে আমি ভাগলাম রুমে। ৭২ ঘন্টার ঘুমতো দিতে হবে। ঐ জামাকাপড়েই ঘুম দিলাম। ভাবছি একেবারে বিকালে গিয়ে বাকী ৮০০ কপি নিয়ে আসবো।
কিছুক্ষণ পরেই কে জানি হাজির হলো। বললাম সমস্যা কি?
বললো- শহীদুল হাসান স্যারের লেখাটা যোগ করতে হবে।
-সেটাতো ছাপতে বলা হয়নি।

তা জানিনা। ওটা সহ বাকী কপি আনতে হবে।

কী আর করা। ডিপার্টমেন্টের সবাই করে ইলেকট্রিক্যাল ডে। আমি দৌড়াই পল্টনে। গিয়ে প্রথমে বাঁধাই বন্ধ। তারপর গেলাম জলি আপার প্রেসে। গিয়ে দেখি ওরা প্রেস বন্ধ করে চলে গেছে। সারারাত চলেছে। মেশিনম্যানের ঠিকানা নিয়ে তার বাসায় গেলাম। তাকে তুলে বললাম চলেন আর এক ফর্মা ছাপা্তে হবে। বললেন – আমার এসিস্ট্যান্ট তো নাই। আমি বললাম অসুবিধা নাই। অফসেট প্রেস আমি চালাতে পারি।

কাজে ছাপা হলো আর এক ফর্মা। তারপর সেগুলো নিয়ে গেলাম পল্টনে। ভাঁজ দিয়ে ঢোকানো হলো বই-এ।
এর মধ্যে নাম নিয়ে হয়ে গেল এক নাটক। ইলেকট্রন, প্রোটন সব নামেই কোন গাইড আছে।

একজন গম্ভীর গলাতে বললো – আমাদের ম্যাগাজিনের নাম হোক মতিট্রন।
-মতিট্রন??
হ্যা। মতিন স্যারের নামে!

মতিন স্যার তখন বিভাগের প্রধান। স্যার মোটামুটি এসব অনুষ্ঠানের বিরোধী। সেজন্য ডিন স্যার এখানে ইনভলভ। যাই হোক শেষ পর্যন্ত পজিট্রন নামে সম্ভবত ম্যাগাজিনটা বের হয়েছিল।

মুজিবুর রহমান স্যার আর লুৎফুল কবীর স্যারের সঙ্গে আমার কোন কাজ সেবারই প্রথম। স্যারদের সে কথা মনে আছে কি না জানি না।
স্যারের মুখে গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়ারের কথা শুনে মনে পড়লো পাস করার পর প্রথম ক্যান্টন্টমেন্টে একটা পদে এপ্লাই করেছিলাম। তবে, তারা আমাকে ডাকার কোন প্রয়োজন বোধ করেনি। সেটাই জানালাম।

তারপর স্যার বললেন – তোমার কথা আমরা ভেবেছি।
আমি বললাম – স্যার, আমি তো কম্পিউটার জানি না।
স্যার বললেন, “আমি কম্পিউটার জানা কোন লোককে খুঁজছি না। আমরা সিনসিয়ার এবং চ্যালেঞ্জ নিতে পারে এমন একজনকে খুঁজছি। যে কিনা কাজ শিখে নিতে পারে। তোমার চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পার্টটা আমি দেখেছি।”

আমি একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। স্যারকে তো বলতে পারি না, ফাঁকি দেওয়ার জন্য হাই ভোল্টেজ পড়েছি। কম্পিউটারের জটিলতায় যেতে চাইনি। যেহেতু তখন কেউ নিজে থেকে হাই ভোল্টেজ পড়ে না। কাজে ক্লাস তেমন একটা হয় না।

স্যার কি যেন ভেবে বললেন, “এখানে বসে একটা দরখাস্ত করো।”

কিন্তু আমার কাছে তো কোন জীবন বৃত্তান্ত নাই!!! দরখাস্ত কেমনে করি?

আরও পড়তে পারেন:
পড়তে পড়তে যায় বেলা
কথা নয়, নেমে পড়
পিপি লংস্টকিং - দস্যি মেয়ের দশচক্রে
পড়ো পড়ো পড়ো : একাত্তরের স্মৃতি - বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা
করো করো করো -১