August 12th, 2016

puran৬ আগস্ট শনিবার প্রায় সারাদিন আমি পুরান ঢাকার পগোজ ল্যাবরেটরি স্কুলে কাটিয়েছি। সেখানে প্রথম আলো পুরান ঢাকা বিতর্ক উৎসব হয়েছে। প্রথম রাউন্ড বিতর্কে যখন ১৩-১৪টা স্কুল হেরে গেল তখন আমরা তাদের জন্য একটা বারোয়ারি বিতর্কের আয়োজন করি। বিষয় ছিল –“আমার স্বপ্নগুলো …”।
ক্লাশ সিক্স থেকে টেনের ছোট ছোট বিতার্কিকরা তাদের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বলেছে তারা “কী হতে চায়”। কেও ডাক্তার, কেও প্রকৌশলী, অনেকেই শিক্ষক হতে চেয়েছে। একজন মাত্র বলেছে সে পাইলট হতে চায় কারণ, “পাইলট হলে যে কোন দেশে যাওয়া যায় এবং অনেক টাকা বেতন পাওয়া যায়।”। তবে, “আমার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আমাকে পুরান ঢাকার মেয়র হতে হবে” এই কথাটা একজন শিক্ষার্থী বলেছে এবং সে ঢাকাই ভাষাতেই নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছে।
ওদের চিন্তার জগতটা জুড়ে রয়েছে, “আমি কী হতে চাই”।
কিন্তু ওরা যখন আর একটু বড় হবে, যখন ভার্সিটিতে যাবে?

তখনও কি চিন্তার জগৎটা এমন থাকবে?

ইউনিভার্সিটি লেভেলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার নিয়মিতই যোগাযোগ আছে। কাজে আমি জানি ওদের বেশিরভাগেরই চিন্তার জগতটা হলো – “আমি কী করতে চাই”!!! এবং আমরা সম্ভবত তাদেরকে সেই দিকে ঠেলছি।

mubinগতকাল একটা চমৎকার বৃক্তৃতা শুনেছি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে। প্রথম আলো ইএটিএল এপস প্রতিযোগিতার একটা সেমিনার ছিল সেখানে। প্রধান অতিথি ছিলেন ড. এ কে আবুল মোমেন, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ফ্যাকাল্টি এবং এক সময় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়েই শুনেছে। সামারি করতে গিয়ে যে কথাটা তিনি বলেছেন সেটা হলো – You can do। জোর দিয়েছেন ঐ “ডু” তে।

ফেরার সময় ঐ “ডু” নিয়ে ভাবছিলাম। আমাদের ছোটবেলার চেতনা জগতের “হওয়া” কোন ফাঁকে “করা” হয়ে যায়?

 

সকাল থেকে এই নিয়ে একটু পড়ার চেষ্টা করলাম। এক ভদ্রলোক বলছেন এটা শুরু হয়েছে মার্ক লিখিত সুসমাচার থেকে, তিনি বলছেন-

The inspiration for the thought came from the gospel of Mark, the tenth chapter.

“Now as He was going out on the road, one came running, knelt before Him, and asked Him, ‘Good Teacher, what shall I do that I may inherit eternal life?’” — Mark 10:17 (NKJV).

ঐ যে ওখানেও দেখেন আছে “ডু”। অনন্তর জীবনের জন্য “আমি কী করবো?”

তার মানে করাটাই (Doing) কী সব?

আমরা এমন এক জগতে এসেছি যেখানে মনে হচ্ছে সারাক্ষনই কিছু না কিছু করতে হবে।

কয়েকবছর আগে আমি একটা প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালনা করি। ৮-১০টা দেশের প্রতিনিধি. দুই দিনের ট্রেনিং। আমার সঙ্গে আর একজন ফ্যাসিলিটেটর ছিলেন আইসেস্কুর একজন পরিচালক (নাম মনে নেই), একজন ইরানী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা।

ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আমরা আলাপ করেছি নানান বিষয়ে। একটা ছিল এই ডুয়িং নিয়ে।তার একটা পর্যবেক্ষণ খুব ভাবায় আমাকে। তিনি বলছিলেন

“মুনির, আমি যখন সহকারি সচিব হিসাবে কাজ শুরু করি তখন কম্পিউটার ছিল না। আমার কর্মদক্ষতা মাপা হতো দিনে কয়টা চিঠি (অর্ডার, নোটিশ, নির্দেশনা ইত্যাদি) আমি ইস্যু করতে পেরেছি তার ওপর। কাজগুলো হতো টাইপ রাইটার মেশিনে। কোনো একটা চিঠিতে একটা ছোট্ট ভুলের জন্য পুরো চিঠিটা আবার টাইপ করা লাগতো। এটা আমাদের সিনিয়ররাও জানতেন। কাজে দিন শেষে ৩-৪টা ডেসপ্যাচই একজন সহকারি সচিবের জন্য অনেক বড় কাজ (যারা জানে না তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি সরকারি দপ্তরে একটি চিঠি ইস্যু করা কেবল টাইপ করা নয় কিন্তু)।
তো, দিন যেতে যেতে পেয়ে গেলাম ইলেকট্রনিক টাইপ মেশিন যেখানে ফ্লুয়িড মারার ব্যবস্থা ছিল ফলে চিঠির সংখ্যা বাড়লো।

তোমাদের দেশের আগেই, আশির দশকেই আমাদের সরকারি অফিসগুলোতে কম্পিউটার চলে আসলো। ততোদিনে আমি ওপরের দিকে উঠেছি। কম্পিউটার আসার পর আমরা দেখলাম একটা চিঠির একটা ভুল সংশোধনের জন্য পুরোটা চিঠিটা নতুন করে টাইপ করতে হয় না। এক পাতার চিঠিকে ঠিক রেখেই সেটাকে বড় করা যায়। অর্থাৎ আগে যে চিঠিটা চূড়ান্ত হতে ৩/৪ বার টাইপ করা লাগতো সেটা কেবল সংশোধন/পরিমার্জন হয়েই চূড়ান্ত হচ্ছে।
কাজে আমার সহকারি সচিবের কাছে আমার প্রত্যাশা কিন্তু বেড়ে গেলে। তখন ৩/৪টা চিঠিতে সন্তুষ্টি নাই! সেটি ১০-১২টাতে উঠে গেল।

তারপর আমার চাকরি জীবনেই চলে আসলো ইন্টারনেট – সরকারি কর্তকর্তারা দুইটি তাৎক্ষণিক সুবিধা পেয়ে গেল। একটা হলো কোন দপ্তর থেকে কিছু তথ্য জানা। আগে এটার জন্য একটা চিঠি ডাকযোগে পাঠাতে হতো। উদ্দিষ্ট অফিস সেই চিঠি পেয়ে ফাইলে নোট দিতো – অমুক অফিস আমাদের কাছে এই তথ্য চেয়েছে। তথ্য নিয়ে একটা খসড়া চিঠি করা হয়েছে। অনুমোদিত হরে সেটা প্রেরণ করা যায়। এই অংশটা গায়েব হয়ে গেল। তারপর আবার ই-মেইলে মুহূর্তের মধ্যে পাঠানো সম্ভব হলো। ফলে আর ১০টাতেও সন্তুষ্টি হলো না।

মরার ওপর খাড়ার ঘা হলো যে কেও সরকারি দপ্তরে একটা ই-মেইল পাঠাতে পারে যা কিনা একই সঙ্গে আমার সহাকারি সচিবও পায় আমিও পাই। ফলে, সে ফাইলে “পুট-আপ” দেওয়ার আগেই আমি তাকে ই-মেইলে নির্দেশনা দিয়ে দিতে পারি। ফলে মাঝখানে অনেকগুলো স্টেপ না হয়ে গেল। এমনকি ইচ্ছে করলে আমি নিজেই সরাসরি ই-মেইলের জবাব দিয়ে দিতে পারি। তাতে সহকারি সচিবের ফাইলে পুট-আপ দেওয়ার কস্টটা থাকছে না। ফলে, আমাদের কাছে সরকারের প্রত্যাশাও অনেক বেড়ে গেল।

আমার রিটায়ারমেন্টের কয়েকদিন আগেই চলে আসলো মোবাইল ফোন আর মোবাইল ইন্টারনেট। এখন আমার স্যার রাত দশটায় একটা পার্টি থেকে আমাকে এসএমএস কিংবা ই-মেইল পাঠিয়ে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে দিচ্ছে। সেটা পেয়ে আমার “ফোন” ও টুং করে উঠছে। আমি হয়তো আমার ছেলের সঙ্গে ওর দাদার গল্প বলছিলাম। এসএমএস/ই-মেইল পেয়ে আমার চিন্তা আবার অফিসেই ফিরে গেল।

আর এমন করে আমরা “হিউম্যান বিইং” থেকে “হিউম্যান ডুয়িং” হয়ে উঠলাম্!!!”

being-and-doing

তো হিউম্যান ডুয়িং হওয়াই কী মানুষের নিয়তি?

 

এই প্রশ্নের উত্তরই আমি এই নতুন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করছি। স্টে টিউন। জয় বাংলা।
 

 

 

আরও পড়তে পারেন:
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-১
"মন্তব্য পড়ো না"!!!
আলবেয়ার কামু, স্টিফেন হকিং এবং আগামীর বিপদ!!!
গুগলে ক্যামতে কী?
আমি কি তোমার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পারি?